২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে ১ আগস্ট ছিল আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচি ঘিরে সেদিন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অনেক জায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধা, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং শিক্ষার্থী আটকের ঘটনা ঘটে।
কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে ১৬ জুলাই থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনার পর আন্দোলনকারীরা জুলাই মাসকে প্রতীকীভাবে দীর্ঘায়িত করার ঘোষণা দেয়। সেই ধারাবাহিকতায় ১ আগস্টকে তারা ‘৩২ জুলাই’ হিসেবে আখ্যা দেয়।
সেদিন ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিহত ও আহতদের স্মরণে নানা কর্মসূচি পালিত হয়। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, আইনজীবী, সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে আন্দোলনের স্মৃতিচারণ, নিহতদের স্মরণ, দেয়াল লিখন, গ্রাফিতি অঙ্কন, ফেস্টুন তৈরি এবং বিভিন্ন সৃজনশীল আয়োজন করা হয়। এর আগের দিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
এদিন সন্ধ্যায় আন্দোলনের পক্ষ থেকে ২ আগস্ট ‘প্রার্থনা ও ছাত্র-জনতার গণমিছিল’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। আন্দোলনের সমন্বয়কদের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে শহীদ, আহত, পঙ্গু ও গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের স্মরণে দেশব্যাপী দোয়া, প্রার্থনা ও গণমিছিল আয়োজনের আহ্বান জানানো হয়।
১ আগস্টের আরেকটি আলোচিত ঘটনা ছিল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়কের মুক্তি। দুপুরে তারা ডিবি কার্যালয় ত্যাগ করেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, মুক্তির আগে তারা অনশন কর্মসূচি পালন করেছিলেন এবং শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন।
একই দিন সরকার নির্বাহী আদেশে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার আওতায় জারি করা প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
এদিকে আন্দোলনের ৯ দফা দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে কর্মসূচি পালিত হয়।
দেশের বাইরেও আন্দোলনের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে শিক্ষার্থী হত্যার বিচার দাবি করেন।
সেদিন দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনেও নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিভিন্ন সংগঠন সরকারের সমালোচনা করে বক্তব্য দেয়, অন্যদিকে জাতিসংঘ বাংলাদেশের অনুরোধ পেলে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনাগুলোর তদন্তে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলে জানায়।
একই দিনে কোটা আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত সহিংসতা, প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা তদন্তে হাইকোর্ট বিভাগের তিন বিচারপতির সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিশন গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
১ আগস্ট ২০২৪—যা আন্দোলনকারীদের ভাষায় ছিল ‘৩২ জুলাই’—বাংলাদেশের গণআন্দোলনের ইতিহাসে স্মরণ, প্রতিবাদ এবং নতুন কর্মসূচির ঘোষণায় ভরপুর এক গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।