২০২৪ সালের আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহে ২ আগস্ট ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। আন্দোলনকারীরা প্রতীকীভাবে দিনটিকে ‘৩৩ জুলাই’ হিসেবে উল্লেখ করে দেশজুড়ে গণমিছিলের কর্মসূচি পালন করেন। এর আগের দিন ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিকে ঘিরে উত্তেজনার পর আন্দোলন নতুন গতি পায় এবং রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসেন।
জুমার নামাজের পর ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, কুমিল্লা, হবিগঞ্জ, লক্ষ্মীপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টি ও নিরাপত্তা বাহিনীর বাধার মধ্যেও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
রাজধানীর উত্তরা এলাকায় গুলির ঘটনা ঘটে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সে সময় দায়-দায়িত্ব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দেখা দেয়। একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি কথিত বার্তা ছড়িয়ে পড়ে, যা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ওই দিন কয়েক ঘণ্টার জন্য ফেসবুক বন্ধও রাখা হয়।
এদিকে, আগের দিন গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজত থেকে মুক্ত হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ক—নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার ও নুসরাত তাবাসসুম—এক যৌথ বিবৃতিতে জানান, হেফাজতে থাকা অবস্থায় তাদের দিয়ে যে ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয়েছিল, সেটি তাদের স্বতঃস্ফূর্ত সিদ্ধান্ত ছিল না। তারা আন্দোলনের ঘোষিত ৯ দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন এবং পরদিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশের আহ্বান জানান।
খুলনায় জুমার নামাজের পর জিরো পয়েন্ট এলাকায় বড় সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকাতেও পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
হবিগঞ্জে গণমিছিলকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরবর্তী সময়ে সেখানে রাজনৈতিক কার্যালয়ে ভাঙচুর ও স্থানীয় এক সংসদ সদস্যের বাড়িতে হামলার ঘটনাও ঘটে।
সেদিনের কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে শিল্পী, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও রাজপথে নামেন। ধানমন্ডির সাত মসজিদ রোডে ‘দৃশ্যমাধ্যম শিল্পীসমাজ’-এর ব্যানারে চলচ্চিত্র, নাটক ও সংগীত অঙ্গনের ব্যক্তিরা বৃষ্টির মধ্যেই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেন। এছাড়া জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে সাংস্কৃতিক কর্মী, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের অংশগ্রহণে একটি ‘দ্রোহযাত্রা’ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, ২ আগস্টের এই গণমিছিল ও দেশজুড়ে সংঘটিত ঘটনাগুলো পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল এবং আন্দোলনের গতিপথে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।