ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের হেবরন শহরের পুরোনো এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক ইব্রাহিমি মসজিদ। মুসলিমদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এই ধর্মীয় স্থাপনাটি একই সঙ্গে ইহুদি ও মুসলিম ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। স্থাপনাটিকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিরোধও চলে আসছে।
বিশাল পাথরের দেয়ালঘেরা স্থাপনাটির নিচে একটি গুহা রয়েছে, যা ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী নবী ইবরাহিম (আ.), ইসহাক (আ.) ও ইয়াকুব (আ.)-সহ কয়েকজন নবী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সমাধিস্থল হিসেবে বিবেচিত হয়। ইহুদি ঐতিহ্যেও স্থানটি ‘কেভ অব দ্য প্যাট্রিয়ার্কস’ বা পিতৃপুরুষদের গুহা নামে পরিচিত।
বর্তমানে স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ মুসলিম ও ইহুদি উপাসনার জন্য ব্যবহৃত হয়। সেখানে প্রবেশ ও ইবাদতের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাব্যবস্থা ও বিধিনিষেধ রয়েছে।
ইব্রাহিমি মসজিদ পশ্চিম তীরের দক্ষিণাঞ্চলের হেবরন শহরের পুরোনো অংশে অবস্থিত। স্থাপনাটি মূলত একটি প্রাচীন সমাধি-স্থাপনার ওপর গড়ে উঠেছে বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
মসজিদের চারপাশে বিশাল পাথরের দেয়াল রয়েছে। স্থাপনাটির অভ্যন্তরে প্রাঙ্গণ, বারান্দা, কক্ষ, করিডর, গম্বুজ ও মিনার রয়েছে। ভূগর্ভস্থ অংশটি ‘মাকফিলা গুহা’ নামে পরিচিত।
গুহাটিকে ঘিরে নবী ইবরাহিম (আ.), তাঁর স্ত্রী সারাহ, নবী ইসহাক (আ.), ইয়াকুব (আ.) ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সমাধি থাকার ঐতিহ্য প্রচলিত রয়েছে। তবে এসব সমাধির সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও ঐতিহাসিক প্রমাণ নিয়ে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক মত রয়েছে।
মুসলমানদের কাছে এটি ‘মসজিদে ইব্রাহিমি’ বা ‘আল-ইব্রাহিমি হারাম’ নামে পরিচিত। নবী ইবরাহিম (আ.)-এর নামের সঙ্গে এর নাম যুক্ত।
ইহুদি ধর্মীয় ঐতিহ্যে স্থানটি ‘মাকপেলা গুহা’ বা ‘কেভ অব দ্য প্যাট্রিয়ার্কস’ নামে পরিচিত। বাইবেলীয় বর্ণনায় পিতৃপুরুষদের সমাধির সঙ্গে এই গুহার সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে।
এই কারণে স্থাপনাটি মুসলিম ও ইহুদি—উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ইব্রাহিমি মসজিদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর বিশাল পাথরের দেয়াল। ঐতিহাসিকভাবে এই দেয়ালকে হেরোডীয় আমলের স্থাপত্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। বড় আকারের পাথরের ব্লক দিয়ে নির্মিত দেয়ালগুলো স্থাপনাটির প্রাচীনত্বের অন্যতম নিদর্শন।
পরবর্তী বিভিন্ন শাসনামলে স্থাপনাটিতে সংযোজন, সংস্কার ও পরিবর্তন হয়েছে। ফলে বর্তমান স্থাপত্যে বিভিন্ন সময়ের নির্মাণশৈলীর প্রভাব দেখা যায়।
মসজিদের ভেতরে কয়েকটি নামাজের স্থান, মিহরাব, গম্বুজ ও ঐতিহাসিক কক্ষ রয়েছে। এসব স্থানের অনেকগুলো নবী ও ইসলামী ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের নামের সঙ্গে যুক্ত।
ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, হেরোডীয় আমলে এ স্থানের চারপাশে বিশাল দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে রোমান ও বাইজেন্টাইন শাসনের সময় স্থাপনাটির ব্যবহার ও কাঠামোয় পরিবর্তন আসে।
৬১৪ খ্রিস্টাব্দে পারস্য বাহিনীর আক্রমণের সময় এখানকার খ্রিস্টীয় স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর স্থাপনাটি মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। উমাইয়া ও পরবর্তী আব্বাসীয় শাসনামলে এর সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়।
ফাতেমীয় শাসনামলেও স্থাপনাটিতে বিভিন্ন স্থাপত্য সংযোজন করা হয়। গম্বুজ, কক্ষ ও অন্যান্য কাঠামোর পরিবর্তনের মাধ্যমে এর ইসলামী স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১১ শতকের শেষদিকে ক্রুসেডাররা হেবরন দখল করলে ইব্রাহিমি মসজিদের ওপরও তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। স্থাপনাটিকে খ্রিস্টীয় উপাসনালয়ে রূপান্তর করা হয় এবং আশপাশে সামরিক স্থাপনা গড়ে তোলা হয়।
প্রায় এক শতাব্দী পর ১১৮৭ সালে হিত্তিনের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর বিজয়ের পর সালাহউদ্দিন আইয়ুবি হেবরন পুনর্দখল করেন। এরপর স্থাপনাটি আবার মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সালাহউদ্দিন আইয়ুবির সঙ্গে এই মসজিদের অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন—কাঠের মিম্বরটির—সম্পর্ক রয়েছে।
ইব্রাহিমি মসজিদের অন্যতম মূল্যবান নিদর্শন হলো কাঠের মিম্বরটি। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, মিসরে ফাতেমীয় আমলে মিম্বরটি নির্মাণ করা হয়েছিল। পরে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি এটি আসকালান থেকে হেবরনে নিয়ে আসেন।
আবনুস কাঠ দিয়ে তৈরি মিম্বরটিতে সূক্ষ্ম কারুকাজ রয়েছে। কাঠের বিভিন্ন অংশ জোড়া লাগিয়ে এটি নির্মাণ করা হয় এবং ঐতিহ্যবাহী কাঠের শিল্পকর্ম হিসেবে এর বিশেষ মূল্য রয়েছে।
উসমানি শাসনামলে ইব্রাহিমি মসজিদে একাধিকবার সংস্কার করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ ম্যান্ডেট আমলেও স্থাপনাটির ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণে পরিবর্তন আসে।
পরবর্তী সময়ে হেবরন জর্ডানের নিয়ন্ত্রণে থাকাকালে মসজিদটির বিভিন্ন অংশ সংস্কার করা হয় এবং এর ইসলামী স্থাপত্য সংরক্ষণে কাজ করা হয়।
১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর পশ্চিম তীরসহ হেবরন ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এরপর শহরের কিছু এলাকায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপন শুরু হয়।
ইব্রাহিমি মসজিদকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। মসজিদে মুসলিম ও ইহুদি উপাসনার জন্য পৃথক অংশ ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয় এবং প্রবেশ ও চলাচলের ওপর বিভিন্ন নিরাপত্তা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
ইব্রাহিমি মসজিদের ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ১৯৯৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বারুখ গোল্ডস্টেইন ফজরের নামাজের সময় মুসল্লিদের ওপর গুলি চালান।
হামলায় ২৯ জন মুসল্লি নিহত এবং বহু মানুষ আহত হন। পরে হামলাকারীকেও সেখানে উপস্থিত মুসল্লিরা হত্যা করেন।
এই ঘটনার পর ইব্রাহিমি মসজিদের ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। মসজিদটির একটি অংশ মুসলিমদের এবং অন্য অংশ ইহুদি উপাসনার জন্য নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করা হয়।
এরপর থেকেই মসজিদটি হেবরনের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উত্তেজনার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে রয়েছে।
ইব্রাহিমি মসজিদের ভেতরে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
ইসহাকিয়া নামাজের স্থান: মসজিদের প্রধান নামাজের স্থানগুলোর একটি। এখানে সালাহউদ্দিনের মিম্বর এবং নবী ইসহাক (আ.)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত স্থাপনা রয়েছে।
ইব্রাহিমিয়া নামাজের স্থান: নবী ইবরাহিম (আ.)-এর নামের সঙ্গে যুক্ত এই অংশে তাঁর ও তাঁর স্ত্রী সারাহর সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতীকী সমাধি রয়েছে বলে প্রচলিত।
ইয়াকুবিয়া নামাজের স্থান: নবী ইয়াকুব (আ.)-এর নামের সঙ্গে সম্পর্কিত এই অংশটি মসজিদের উত্তর দিকে অবস্থিত।
মালিকিয়া নামাজের স্থান: মসজিদের উত্তর-পশ্চিম অংশে অবস্থিত এই অংশে একটি ঐতিহাসিক মিহরাব রয়েছে।
জাওলিয়া নামাজের স্থান: মামলুক আমলের স্থাপত্যের সঙ্গে যুক্ত এই অংশটি আমির আলমুদ্দিন সানজার আল-জাওলির নামে পরিচিত।
ইব্রাহিমি মসজিদের নিচের গুহাটি স্থানটির ধর্মীয় গুরুত্বের অন্যতম প্রধান কারণ। মুসলিম ও ইহুদি ঐতিহ্যে এই গুহাকে কয়েকজন ধর্মীয় পিতৃপুরুষের সমাধিস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গুহার সঙ্গে সম্পর্কিত বেশ কিছু প্রবেশপথ ও স্থাপনা রয়েছে। তবে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কারণে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য এসব অংশের প্রবেশাধিকার সীমিত।
ইব্রাহিমি মসজিদের কাছেই রয়েছে ইব্রাহিমিয়া তেকিয়া নামে পরিচিত একটি ঐতিহ্যবাহী দাতব্য প্রতিষ্ঠান। এখানে দীর্ঘদিন ধরে দরিদ্র ও অভাবী মানুষের জন্য খাবার বিতরণের রীতি রয়েছে।
বিশেষ করে রমজান মাসে এর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়। স্থানীয় ঐতিহ্যে এই তেকিয়ার সঙ্গে নবী ইবরাহিম (আ.)-এর অতিথিপরায়ণতার স্মৃতিও যুক্ত করা হয়।
হেবরনের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে তাই ইব্রাহিমি মসজিদের পাশাপাশি ইব্রাহিমিয়া তেকিয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য বহন করে।
ইব্রাহিমি মসজিদ শুধু একটি প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি কয়েক হাজার বছরের ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত একটি স্থান। বিভিন্ন যুগে রোমান, বাইজেন্টাইন, মুসলিম, ক্রুসেডার, উসমানি ও আধুনিক রাজনৈতিক শক্তির নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবের মধ্য দিয়ে এর স্থাপত্য ও ব্যবহার পরিবর্তিত হয়েছে।
বর্তমানে মসজিদটির ব্যবস্থাপনা, প্রবেশাধিকার ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে মুসলিম ও ইহুদি—উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত এই স্থাপনাটি হেবরনের ইতিহাস ও ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান।